সোনার প্রাসাদের রাক্ষসী-পর্ব ৩:

পর্ব ৩: রাক্ষসীর ছলনা ও ছয় রানীর দুর্ভাগ্য

রাজদরবারে সবাই চুপ। সিংহাসনে বসে আছেন রাজামশাই। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে রহিম আর সেই সুন্দরী নারী।

নারী চোখে আঁচল চেপে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— "মহারাজ, ইনিই আমার স্বামী। আমাকে বিয়ে করে এখন একা ফেলে পালিয়ে যাচ্ছেন। আমার ভরণপোষণের দায়ও নিতে চান না।"

নারীর কান্না আর কথা শুনে দরবারের অনেকেই রহিমের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাল।

রাজামশাই রহিমকে জিজ্ঞেস করলেন,

— "তুমি কি এই নারীকে চেনো?"

রহিমের গলা কাঁপছিল।

— "না মহারাজ। জীবনে কখনো একে দেখিনি। এ মিথ্যা বলছে।"

কিন্তু কে সত্য বলছে আর কে মিথ্যা, তা বোঝা কঠিন হয়ে গেল। রাজামশাই কিছুক্ষণ ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন।

— "আজ রাতে তোমাদের দুজনকে একই কক্ষে রাখা হবে। যদি রাতের মধ্যে তোমাদের মধ্যে কোনো কথা হয়, কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মতো কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাহলে তোমাদের আবার বিয়ে দিয়ে একসঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।"

রাজার আদেশে রহিম আর সেই নারীকে এক কক্ষে রাখা হলো। রহিম সারারাত দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে রইল। একটা কথাও বলল না, একবারও ফিরে তাকাল না।

সকালে পাহারাদার এসে রাজাকে জানাল,

— "মহারাজ, সারারাত এদের মধ্যে কোনো কথা হয়নি। কোনো সম্পর্কও হয়নি।"

শুনে রাজামশাই রহিমকে নির্দোষ বলে মেনে নিলেন। তাকে মুক্তি দিলেন। আর সেই সুন্দরী নারীকে গ্রহণ করলেন নিজের স্ত্রী হিসেবে।

রাজামশাইয়ের আগে থেকেই ছয়জন স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এই নারীর রূপে তিনি এমন মুগ্ধ হলেন যে আর সব ভুলে গেলেন। বিয়ের পর নতুন রানীই হয়ে উঠল প্রাসাদের সবকিছু। সে কী খেতে চায়, কী পরতে চায়, কী তার পছন্দ, রাজার সব মনোযোগ গেল সেদিকেই।

আর যে ছয় রানী এতদিন রাজার ভালোবাসা পেয়ে এসেছিলেন, তাঁরা ধীরে ধীরে অবহেলার অন্ধকারে সরে যেতে লাগলেন। রানীর মর্যাদা আর রইল না। মনে হতে লাগল, তাঁরা যেন নতুন রানীর দাসী হয়ে গেছেন।

কিন্তু কেউ জানত না, এই সুন্দর মুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে কী ভয়ংকর সত্য।

বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই রাজ্যে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করল। প্রতিদিন কোনো না কোনো বাড়ি থেকে গরু, ছাগল, মহিষ হারিয়ে যেতে লাগল। গ্রামে গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। প্রজারা দল বেঁধে রাজদরবারে এসে কেঁদে পড়ল,

— "মহারাজ, আমাদের পশুগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। দয়া করে একটা ব্যবস্থা করুন।"

রাজামশাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি রাজ্যজুড়ে পাহারা কড়া করার আদেশ দিলেন। চারদিকে সৈন্য মোতায়েন হলো।

কিন্তু এতে বিপদে পড়ল নতুন রানী। আগের মতো আর সে প্রাসাদের বাইরে যেতে পারে না। অথচ সাধারণ খাবারে তার পেট ভরে না। তার চাই কাঁচা মাংস।

দিনের পর দিন ক্ষুধা সহ্য করতে করতে এক রাতে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার নজর পড়ল রাজপ্রাসাদের সবচেয়ে প্রিয় প্রাণীটির ওপর, রাজার বিশাল হাতি।

সকালে উঠে সবাই দেখল, রাজামশাইয়ের প্রিয় হাতিটি আর নেই। মাটিতে শুধু রক্তের দাগ, কিছু হাড় আর চামড়ার টুকরো। আর সবচেয়ে ভয়ংকর কথা, সেসব রাখা হয়েছে ছয় রানীর ঘরের দরজার সামনে।

সেই দৃশ্য দেখে পুরো প্রাসাদে হইচই পড়ে গেল। রাজামশাই রাগে থরথর করে কাঁপছিলেন। ঠিক তখন নতুন রানী ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। গলায় দুঃখের সুর টেনে বলল,

— "মহারাজ, আমার মনে হয় এ ওই ছয়জনেরই কাজ। এরা সাধারণ মানুষ নয়, রাক্ষসী। রাতের অন্ধকারে এরাই মানুষের পশু ধরে খায়।"

রাগে রাজামশাইয়ের মাথা ঘুরে গেল। কিছু যাচাই না করেই তিনি ছয় রানীকে সন্দেহ করে বসলেন।

— "তোমরা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ!"

ছয় রানী কান্নায় ভেঙে পড়লেন। হাত জোড় করে বললেন,

— "মহারাজ, আমরা নির্দোষ। আমাদের ওপর দয়া করুন।"

কিন্তু রাগে অন্ধ রাজার কানে সেসব পৌঁছাল না। তিনি আদেশ দিলেন, ওদের শাস্তি হবে। শেষে ঠিক হলো, ছয় রানীর চোখ উপড়ে ফেলা হবে, তারপর রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হবে।

ছয় রানীর মধ্যে সবচেয়ে ছোট রানী ছিলেন রাজার সবচেয়ে প্রিয়। তিনি কাঁদতে কাঁদতে রাজার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন,

— "মহারাজ, আমি যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, তবে অন্তত আমার একটা চোখ রেখে দিন।"

সেই কান্না শুনে রাজার মনে কিছুটা দয়া হলো। শেষ পর্যন্ত পাঁচ রানীর দুটি করে আর ছোট রানীর একটি চোখ উপড়ে নেওয়া হলো। মোট এগারোটি চোখ।

সেই চোখগুলো তুলে দেওয়া হলো নতুন রানীর হাতে।

তারপর অন্ধ আর আহত ছয় রানীকে রাজ্য থেকে বের করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো গভীর বনে।

চলবে...

 

Comments

Popular posts from this blog

স্বর্গের পথ

সোনার প্রাসাদের রাক্ষসী-পর্ব ১:

The Path to Heaven