সোনার প্রাসাদের রাক্ষসী-পর্ব ১:
পর্ব ১: অজানা
রাজ্যের পথে
অনেক দিন আগের কথা। এক ছোট্ট সুন্দর গ্রামে করিম, রহিম, সুফল
আর সবুজ নামে চার বন্ধু থাকত। চারজনই ছিল যেমন দুরন্ত, তেমনি দুষ্ট। গ্রামের লোকে
তাদের নাম শুনলেই কপাল কুঁচকে ফেলত।
কারো বাগানে আম পাকলে সকালে আর গাছে থাকত না। কারো খোঁয়াড়
থেকে হাঁস-মুরগি উধাও হয়ে যেত, আর সন্ধ্যায় দেখা যেত চার বন্ধু কোথাও বসে ভাগ
করে খাচ্ছে। কত মানুষ কত বার বুঝিয়েছে, কেউ ধমক দিয়েছে, কেউ হাতে-পায়ে ধরেছে।
কিন্তু চারজনের স্বভাব একচুলও নড়েনি।
সেদিন দুপুরে ছকিনা নদীতে গোসল সেরে কলশি ভরে পানি নিয়ে বাড়ি
ফিরছিল। নদীর পাড়ে বসে ছিল রহিম। ছকিনাকে দেখে তার দুষ্টুবুদ্ধি জেগে উঠল। সে
মাটির একটা ছোট ঢিল তুলে নিয়ে হেসে বলল,
— "দেখি তো, ঢিলটা কোথায় গিয়ে লাগে!"
বলেই জোরে ছুড়ে মারল।
ঢিলটা সোজা গিয়ে লাগল ছকিনার কলশিতে। ঠং করে একটা শব্দ হলো,
তারপর কলশির গায়ে ফাটল ধরে গেল। ফাটা জায়গা দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে লাগল।
ছকিনা থমকে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত কিছু বুঝতেই পারল না। তারপর রাগে তার মুখ লাল
হয়ে উঠল।
— "তোমরা আবার শুরু করেছ! আজ আমি তোমাদের মায়েদের সব বলে
দেব!"
ভাঙা কলশি বুকের কাছে ধরে ছকিনা হনহন করে চার বন্ধুর বাড়ির
দিকে হাঁটা দিল।
চার ছেলের মা ছিলেন একে অপরের প্রাণের বান্ধবী। ছকিনার মুখে সব
শুনে তাঁরা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। শেষে একজন ভারী গলায় বললেন,
— "এভাবে চললে আমাদের ছেলেরা কোনোদিন মানুষ হবে না রে।
এবার কিছু একটা করতেই হবে।"
অনেক ভেবে চার মা একটা উপায় বের করলেন। এমন শাস্তি দিতে হবে,
যাতে ছেলেরা নিজেরাই বুঝতে পারে তারা কী করছে।
সন্ধ্যায় আড্ডা শেষ করে চার বন্ধু হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরল।
ঘরে ঢুকে দেখল, মা বিছানায় শুয়ে আছেন, চোখ বন্ধ, মুখ মলিন।
করিম ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
— "মা, কী হয়েছে তোমার?"
মা ক্ষীণ গলায় বললেন,
— "শরীরটা ভালো না বাবা। ভাত রান্না করা আছে, নিজে বেড়ে
খেয়ে নাও।"
সারাদিন ঘোরাঘুরির পর পেটে তখন আগুন জ্বলছে। করিম ছুটে গিয়ে
হাঁড়ির ঢাকনা খুলল। আর সঙ্গে সঙ্গে তার হাত জমে গেল। ভাতের জায়গায় হাঁড়ি ভর্তি
কালো কালো কয়লা!
রাগে তার মাথা গরম হয়ে গেল। সে ঢাকনা ছুড়ে ফেলে বাড়ি থেকে
বেরিয়ে এল। আড্ডার জায়গায় গিয়ে দেখে বাকি তিনজনও এসে গেছে, আর তিনজনের মুখেই
একই কথা। সবার বাড়িতেই একই ঘটনা।
অভিমান আর জেদ একসঙ্গে ওদের বুকে চেপে বসল। চারজন ঠিক করল, এ
বাড়িতে আর কোনোদিন ফিরবে না।
— "যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই চলে যাব।"
চার বন্ধু ঘোড়ায় চড়ে বসল। তারপর মাঠের পর মাঠ, গ্রামের পর
গ্রাম পেরিয়ে চলল। কত পথ হাঁটল, তার হিসাব ওরা নিজেরাও রাখেনি।
একসময় ওরা এসে দাঁড়াল এক বিশাল অন্ধকার বনের সামনে।
বনে ঢুকতেই গা ছমছম করে উঠল। চারদিকে আকাশছোঁয়া গাছ, ডালপালা
এমন ঘন যে সূর্যের আলো মাটি অবধি পৌঁছায় না। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, কোথাও
কোনো শব্দ নেই। পাখির ডাক নেই, পশুর সাড়া নেই, পাতার খসখসানিও নেই। এমন থমথমে বন
ওরা জীবনে দেখেনি।
করিম গলা নামিয়ে বলল,
— "বন্ধুরা, আমার ভালো লাগছে না। চল ফিরে যাই।"
সবুজ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল,
— "যে বাড়ি ছেড়ে এসেছি, সেখানে আর ফিরব না। যা হওয়ার
হবে।"
সুফলও বলল,
— "যখন বেরিয়েই পড়েছি, সামনে কী আছে দেখেই যাব।"
করিম আর কিছু বলল না। চারজন আবার ঘোড়ার লাগাম টেনে বনের আরও
গভীরে ঢুকে গেল।
কিছুদূর যেতেই হঠাৎ বনের ফাঁকে কী যেন ঝলমল করে উঠল। ওরা চোখ
কচলে তাকাল। দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল রাজপ্রাসাদ, এত সুন্দর যে মনে হয়
পুরোটাই সোনা দিয়ে গড়া।
কিন্তু কেমন যেন লাগল। এত বড় প্রাসাদ, অথচ আশেপাশে একটা মানুষ
নেই। কোনো পাহারাদার নেই, কোনো কর্মচারী নেই, কোনো সাড়াশব্দ নেই।
তবু খিদেয় তখন ওদের পেট মোচড় দিচ্ছে। খাবারের আশায় ওরা পা
টিপে টিপে প্রাসাদের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
কেউ জানত না, ওই দরজার ওপারেই অপেক্ষা করছে ওদের জীবনের
সবচেয়ে ভয়ংকর রহস্য।
চলবে...

Comments
Post a Comment