বালির দানার অভিশাপ | একটি নৈতিক ও কল্পকাহিনি

 


অনেক অনেক দিন আগের কথা। নদীর ধারে ছোট একটা গ্রাম, আর সেই গ্রামে ছিল এক মেয়ে, নাম তার মালতী। তার রূপের কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। সে যখন নদীর ঘাটে জল আনতে যেত, বাতাসও যেন থমকে দাঁড়াত। চাঁদের আলোও তার মুখের কাছে ম্লান হয়ে যেত। লোকে বলত, "এমন রূপ মানুষের ঘরে জন্মায় না গো, এ নিশ্চয়ই কোনো দেবীর ছায়া।"

সেই রূপের খবর একদিন পৌঁছে গেল স্বর্গ অবধি।

এক সন্ধ্যায়, যখন আকাশে সোনালি আলো মিলিয়ে যাচ্ছে, নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ালেন এক দেবতা। মালতীকে এক নজর দেখেই তাঁর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। হাজার বছরের স্বর্গবাসে এমন কিছু তিনি কখনো দেখেননি। হাত জোড় করে, কাঁপা গলায় বললেন, "আমি স্বর্গের দেবতা। তোমাকে দেখার পর থেকে আমার আর কিছুই ভালো লাগছে না। আমাকে বিয়ে করবে, মালতী?"

মালতী অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তার মনে ভয় ছিল। দেবতা তো চিরজীবী, আর সে মানুষ। আজ যে রূপ আছে, কাল তা থাকবে না। যে ভালোবাসা রূপ দেখে জন্মায়, রূপ গেলে সে কি টিকবে? তবু সে তাকাল দেবতার চোখের দিকে, সেখানে সত্যিকারের আকুলতা দেখতে পেল।

সে নদীর ধারের দিকে আঙুল তুলল। সেখানে বিশাল এক বালির ঢিপি, সূর্যের শেষ আলোয় চিকচিক করছে।

"ওই যে বালির ঢিপি দেখছেন, ওখানে যতগুলো দানা আছে, আমার আয়ু ততগুলো বছর করে দিতে হবে। আপনি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন, তাহলে পারবেন?"

প্রেমে অন্ধ দেবতা একবারও ভাবলেন না। সেই মুহূর্তে মালতীর হাসিমুখটাই ছিল তাঁর কাছে পুরো বিশ্ব। তিনি হেসে বললেন, "এ আর এমন কী! যাও, ওই ঢিপিতে যতগুলো বালির দানা আছে, তোমার আয়ু ততগুলো বছরই হবে। এই আমার বর।"

দেবতার বর কখনো মিথ্যে হয় না।

দুজনের বিয়ে হলো। কিছুদিন তাদের সংসার চলল সুখে, হাসিতে, গল্পে। ভোরের নদীর ধারে হাত ধরে হাঁটা, সন্ধ্যায় প্রদীপের আলোয় পাশাপাশি বসে থাকা। মালতী ভাবত, এ সুখ বুঝি কখনো ফুরোবে না।

কিন্তু একদিন স্বর্গ থেকে ডাক এল। দেবতাকে ফিরে যেতে হবে। যাওয়ার সময় মালতীর চোখ ভিজে উঠল। সে দেবতার হাত আঁকড়ে ধরে বলল, "আবার আসবে তো?"

দেবতা তার কপালে হাত রেখে বললেন, "আসব।"

মালতী মনকে বোঝাল, আমার তো আয়ু অফুরন্ত। দেখা হোক বা না হোক, অপেক্ষা করার সময় তো আমার অনেক আছে।

সে জানত না, এই অফুরন্ত সময়ই একদিন তার সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে দাঁড়াবে।

দিন গেল, মাস গেল, বছর গড়িয়ে গেল। দেবতা আর ফিরলেন না।

যে মুখ একদিন চাঁদকে হার মানাত, তাতে ধীরে ধীরে বলিরেখা পড়ল। কালো ঢেউখেলানো চুল রুপোর মতো সাদা হয়ে গেল। যৌবন গেল, প্রৌঢ়ত্ব এল, তারপর এল বার্ধক্য। হাতের চামড়া ঝুলে পড়ল, আঙুলগুলো শুকিয়ে কাঠির মতো সরু হয়ে গেল। কোমর বেঁকে গেল, পা আর শরীরের ভার বইতে চায় না। যে রূপের জন্য স্বর্গের দেবতা নেমে এসেছিলেন, তার আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।

একদিন সে টের পেল, চোখের সামনের পৃথিবীটা ঝাপসা হয়ে আসছে। প্রথমে মানুষের মুখ মিলিয়ে গেল, তারপর নদীর রং, তারপর আকাশের আলো। একদিন সব অন্ধকার।

তবু মৃত্যু এল না।

বালির দানার হিসেব যে শেষ হয়নি। কত লক্ষ দানা ওই ঢিপিতে, কে জানে!

একে একে সবাই চলে গেল। যে বাবা-মা তাকে কোলে নিয়েছিলেন, যে সখীরা তার সঙ্গে ঘাটে জল ভরত, যাদের সঙ্গে সে হেসেছে, খেলেছে, ঝগড়া করেছে, কেউ আর বেঁচে রইল না। গ্রামের মানুষ বদলে গেল, তাদের ছেলেমেয়ে, তাদের নাতি-নাতনিও একসময় মাটিতে মিশে গেল। নতুন প্রজন্ম এই কুঁজো, অন্ধ বুড়িকে দেখে ভয় পেত, পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কেউ জানত না, এই বুড়িই একদিন ছিল গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে।

দেবতার পথ চেয়ে সে অপেক্ষা করত। কিন্তু দেবতাদের কাছে মানুষের একটা জীবন তো চোখের পলক মাত্র। হয়তো তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন। আর যদি কখনো ফিরেও আসতেন, এই জরাজীর্ণ বুড়িকে কি চিনতে পারতেন? সে নিজেই কি আর নিজেকে চিনত?

প্রতিটি রাত তার কাছে হয়ে উঠল এক অন্তহীন যন্ত্রণা। শরীর ভেঙে পড়ছে, হাড়ে হাড়ে ব্যথা, তবু প্রাণ যায় না। একা অন্ধকারে শুয়ে সে ভাবত, একদিন যে বর চেয়েছিলাম, সেটাই আজ আমার সবচেয়ে বড় অভিশাপ। সে কেন বুঝল না, আয়ু মানে শুধু বছরের সংখ্যা নয়। আয়ু মানে সঙ্গ, হাসি, স্বাস্থ্য, ভালোবাসার মানুষ। সেসব ছাড়া দীর্ঘ জীবন তো শুধু দীর্ঘ শূন্যতা।

সে দুই কম্পিত হাত আকাশের দিকে তুলে কাঁদত, "হে ঈশ্বর, আমাকে মুক্তি দাও। আমি আর পারছি না। আমাকে মরতে দাও।"

কিন্তু তার সেই কান্না শোনার কেউ ছিল না। শুধু নদীর বাতাস একটু থমকে দাঁড়াত, তারপর আবার বয়ে চলত।

আজও লোকে বলে, গভীর রাতে নদীর ধারে সেই বালির ঢিপির কাছে গেলে নাকি এক বৃদ্ধার চাপা কান্নার শব্দ শোনা যায়। যেন কেউ বহু যুগ ধরে একটাই প্রার্থনা করে চলেছে, একটু শান্তি, একটু মৃত্যু।


শিক্ষা: লোভ আর মোহের বশে যা চাওয়া যায়, তা সবসময় আশীর্বাদ হয় না। রূপ, যৌবন, আয়ু, কিছুই চিরস্থায়ী নয়, আর সেই ক্ষণস্থায়িত্বেই জীবনের আসল মূল্য। যা সীমিত, তাই-ই সুন্দর। আর যে চাওয়ার সঙ্গে বিবেচনা থাকে না, তা একদিন নিজের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়।

Comments

Popular posts from this blog

স্বর্গের পথ

সোনার প্রাসাদের রাক্ষসী-পর্ব ২:

সোনার প্রাসাদের রাক্ষসী-পর্ব ১: